তোমায় কিছু বলার ছিল



 তোমায় কিছু বলার ছিল




ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে আসা হল দুপুর তিনটায়। চারটায় গোসল সেরে লাঞ্চ করে ক্লান্ত শরীরের শুয়ে আছি বিছানায়।জ্যৈষ্ঠ মাস চারিদিকে গাছে গাছে আম কাঁঠাল লিচু জাম ঝুলে আছে।পাশে চাচার কাঁঠাল গাছে পাকা কাঁঠালের সুগন্ধ বাতাসে ভেসে আসছে।


গোধূলি লগ্নে বের হলাম পাকা কাঁঠালের খুঁঝে দেখি চাচার গাছে কাঁঠালের ভারে ডালগুলো নিচের দিকে নুয়ে পড়ছে।আমার পরনে ছিল সবুজ ড্রেস।  কাঁঠাল গাছের সবুজ পাতা গুলো আমার গায়ে মুখে পড়ছে।আমি কাঁঠাল পারার জন্য কাঁঠালের উপর  আমার হাত রাখিতেই 
হঠাৎ পিছন থেকে একটি লোক আমায় বলছে। এই সবুজ পরী এ কি করছো তুমি!!!

আমি পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি মুখবর্তী দাঁড়ি সাদা পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক।আমি বললাম, কে আপনি আমাকে এভাবে বলছেন কেন? ভদ্রলোক আমাকে বলে আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখনা!!! একি সোহেল ভাই তুমি!!!

অনেকদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা! বলতো তুমি কেমন আছো? আমি যখন প্রথম হাই স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হই সেই থেকে তোমার সঙ্গে আমার পরিচয়।তুমি তখন আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে ক্লাস এইটে পড়ো।তুমি রোজ বিকেলে আমাদের বাড়িতে আসতে আমার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে।তখন আমার চাচাতো ভাইয়ের বন্ধুরাও আসতো আমাদের বাড়িতে।       
আমাদের বাড়িতে তখন ছোট-বড় মিলে ষাট  জন ছেলে মেয়ে ছিলাম।আমরা বড়রা বিকেল হলে সবাই মিলে যেঠার মস্ত বড়  আম গাছে নিচে বা পুকুরপাড়ে বসে গল্প করতাম তোমরাও  থাকতে আমাদের সাথে।

ঘরের সামনে পিছনে খোলা জায়গা ছোটরা বিকেলে ওখানে খেলা করতো। প্রচন্ড গরমে জোসনা রাতে ঘরের সামনে খোলা জায়গায় আমরা সবাই মিলে হাটাহাটি করতাম।ঘরের উঠোনে ছালার চট বিছায়ে জোসনা রাতে আমরা লেখাপড়া করতাম।

সোহেল ভাই তোমার মনে আছে, তোমরাও কিন্তু পড়ার কাজে অনেক সময় রাত নয়টা পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে থাকতে।কথা বলতে বলতে সোহেল ভাই নিজের হাতে কাঁঠালটা পেরে আমার হাতে দিয়ে বলল, চলো তো আমরা এই গোধূলি লগ্নে আম গাছের নীচে বসে আরো কিছুক্ষণ গল্প করি।
            
আমি বললাম , 
সোহেল ভাই তুমি হয়তো অনেক বছর হল আমাদের বাড়িতে আসো না।আমাদের বাড়ির অনেক কিছুই পাল্টে গেছে।টিনের ঘর ভেঙ্গে এখন দালান হয়েছে।আগের মতো ঘরের সামনে পিছনে খোলা জায়গা নেই।বাড়ির চারপাশে ফলের গাছ  লাগানো হয়েছে। জ্যাঠার সে মস্ত বড় আম গাছটা কেটে সেখানে পারিবারিক গোরস্থান করা হয়েছে।এই কবরে আমার বাবা -মা জ্যাঠা -জেঠি বাড়ির ভাই ভাবী জারা মারা গেছেন সবাইকে এখানে দাফন করা হয়েছে। 
পুকুরের পারটাও আগের মত নেই।আমার কথা শুনে সোহেল ভাই মন খারাপ করে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমায়  বলল,চলো আমরা কবর পাড়ে যেয়ে তারপর আমরা পুকুর পাড়ে  বসি।

তোমাকে আমার কিছু কথা বলার ছিল!!!

পুকুর পাড়ে যেয়ে আমি সোহেল ভাইকে বললাম তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় হওয়ার পর তুমি তো আমাকে মিষ্টি পরী বলে ডাকতে।
 
আজকে তুমি আমাকে সবুজ পরি বলে ডাকলে কেন? সোহেল ভাই হেসে আমাকে বলল , 
তোমাকে কাঁঠাল গাছের সবুজ পাতার মধ্যে সবুজ ড্রেসে সবুজ পরীর মত লাগছিল। 
তাই........ 

আমি হেসে বললাম তোমার দুষ্টুমিটা আগের মতই রয়ে গেছে।সোহেল ভাই কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। 

আমাকে বলল তুমি কি জানো রোজ বিকেলে কেন তোমাদের বাড়িতে আমি যেতাম। তোমাকে মিষ্টি পরি বলে ডাকতাম। ক্লাস করার ফাঁকে ফাঁকে তোমাদের ক্লাস রুমে আমি যেতাম। 
স্কুলের টিফিনের সময় হলে তোমার ক্লাস রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম।তুমি তো চলে এলে ঢাকায়  এরপর  দুই ঈদে তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।তোমাকে কিছু বলব বলে ভেবেছিলাম কিন্তু তা আর বলা হলো না।এর দু'বছর পর তোমার বিয়ে হয়ে চলে গেলে শ্বশুরবাড়ি। 
তখনো তোমাকে কিছু বলতে পারলাম না।তোমার বিয়ের এক বছর পর তোমার সঙ্গে আবার দেখা হল আমি তোমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম।তুমি কিছুই বুঝতে পারলে না এই ভেবে অভিমান করে আমি আর কিছু তোমাকে  বললাম না।
 
এভাবে চার বছর কেটে গেল, 
তুমি অসুস্থ অবস্থায় ময়মনসিং হাসপাতালে ভর্তি হলে। কি অদ্ভুত ব্যাপার!!তোমার পাশের কেবিনে আমার অসুস্থ ভাবীকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম।তোমার সঙ্গে দেখা হল তোমার কেবিনের সামনে  করিডোরে।তোমার অসুস্থতা নিয়ে তোমার সঙ্গে কথা হলো তোমার বরের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলে। এরপর তোমাকে দুবার দেখতে গিয়েছিলাম।কিন্তু তোমার বর তুমি ঘুমিয়ে আছো বলে আমাকে আর তোমার সঙ্গে দেখা করতে দেয়নি।আমি ভেবেছিলাম এটি হয়তো তোমার সাথে আমার শেষ দেখা।আমার কথাগুলো তোমার সঙ্গে আর কখনো বলাই হলো না।এভাবে অনেক বছর কেটে গেল।

 আমার ভার্সিটি পড়া শেষ হল বিসিএস পরীক্ষা দিলাম পাস করে চাকরি পেলাম।আমি বিয়ে করলাম সন্তান হল সংসারটাও ভালোই  কেটে যাচ্ছে।আমি বাড়িতে আসছি হঠাৎ  তোমাকে রাস্তায় দেখতে পেলাম। দূর থেকে তোমাকে চিনতে আমার  একটু সময় লাগেছিল। 

তুমি আসছো জেনে তোমাকে আমার কথাগুলো বলার জন্য তোমার কাছে আমার আসা।
আমি বললাম সন্ধ্যা হয়ে গেছে চলো তো এবার ঘরে ফিরি।

তুমি আমার হাত ধরে বললে তোমার সঙ্গে হয়তো আর কখনোই আমার দেখা হবে না।আমি তোমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম কেন আমার সঙ্গে তোমার আর কখনো দেখা হবে না। 
সোহেল ভাই, আমি আমার বাড়ির সবাইকে বলে দিয়েছি আমার মৃত্যুর পরে আমার কবর যেন আমার মার পাশে হয়। 

তুমি যদি কখনো আমাকে মনে কর তবে আমার কবরের পাশে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দোয়া করো।
 
তুমি আমার হাতটা ধরে রইলে আর বললে তুমি এখনো বড় হলে না। তুমি সেই মিষ্টি পরী মেয়েটাই রয়ে গেলে।আমি এই মিষ্টি পরী মেয়েটাকে খুব মিস করি।তোমার হয়তো আমার কথা কখনো মনে পরবে না। কিন্তু আমি অনন্তকাল তোমাকে মিস করে যাব।
               
                                                              More For You


Comments

Popular posts from this blog

Mobile Technology Trends in 2025

The solar Industry in Bangladesh is rapidly expanding

Denim Styles and their Perfect Fits